ইসরায়েল এখন দুর্ভিক্ষপীড়িত গাজা সিটিতে আরেকটি বড় আকারের আক্রমণ শুরু দ্বারপ্রান্তে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, প্রায় সব ফিলিস্তিনি ও অনেক ইসরায়েলি চাইছে, যুদ্ধ আগে শেষ হোক। গত মাস পর্যন্তও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল। তবে কেন প্রায় দুই বছর পরও এ সংঘাত আরো রক্তক্ষয়ী হতে চলেছে?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সমালোচকরা রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু হামাসকে দায়ী করেন, যাদের হাতে এখনো প্রায় ২০ জন জীবিত জিম্মি রয়েছে। এই ইসরায়েলি নেতার মতে, যুদ্ধকালীন সময়ে ইসরায়েলের কার্যকলাপের সমালোচনা শুধু হামাসকে আরো অবিচল করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি চাইছেন যুদ্ধ শেষ হোক এবং জিম্মিরা ফিরুক। তবে তার দূত স্টিভ উইটকফ গত মাসে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় হামাসকে দায়ী করে বেরিয়ে যান।
প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে মার্চে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের ওপর কোনো প্রকাশ্য চাপও দেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র গোপনে অন্য কোনো কৌশল অনুসরণ করছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
এদিকে হামাস গত সপ্তাহে বলেছে, তারা এমন একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যা মধ্যস্থতাকারীদের মতে আগে ইসরায়েলের অনুমোদন করা একটি প্রস্তাবের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনো প্রকাশ্যভাবে কোনো উত্তর দেয়নি।
সম্প্রতি যে জোটগুলো একটি ব্যাপক চুক্তি খুঁজছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা গোপনে কোনো কাজ করছে কি না, তা অজানা।
নেতানিয়াহু পিছু হটবেন না
ইসরায়েলিরা গণ-বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার জন্য যুদ্ধবিরতি চাচ্ছে। তারা বলছে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন বলেই যুদ্ধ চলছে।
নেতানিয়াহুর শাসক জোট উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোর ওপর নির্ভর করে, যারা চাইছে হামাস ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে, ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে স্থানান্তর সহজতর করতে এবং ২০০৫ সালে ইসরায়েল যে ইহুদি বসতি ধ্বংস করেছিল তা পুনর্নির্মাণ করতে।
তারা হুমকি দিয়েছে, যদি নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ বিজয় ছাড়া যুদ্ধ শেষ করেন, তবে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো বলছে, তারা হস্তক্ষেপ করবে এবং তার সরকারকে সংরক্ষণ করবে যদি তিনি জিম্মি চুক্তি করেন। তবে তাতেও নেতানিয়াহু পরবর্তী নির্বাচনের আগে কঠোরভাবে দুর্বল হয়ে যাবেন।
পদ হারালে ইসরায়েলের এ নেতা দীর্ঘদিনের দুর্নীতি অভিযোগ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামল ঠেকানোর ব্যর্থতার বিষয়ে জনরোষের আরো বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন।
তবে নেতানিয়াহু এমন কোনো উদ্দেশ্য অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সব জিম্মি না ফেরা এবং হামাস পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালাতে হবে। তার মতে, যদি কোনো চুক্তি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটিকে অস্ত্রশস্ত্রসহ অক্ষত রাখে, তাহলে তারা ভবিষ্যতে আবার বড় আক্রমণ চালানোর সুযোগ পাবে।
হামাস আত্মসমর্পণ করবে না
নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধ আগামীকালই শেষ হতে পারে, যদি হামাস জিম্মিদের মুক্তি দেয় এবং অস্ত্র ত্যাগ করে।
কিন্তু তিনি এ-ও বলেছেন, ইসরায়েল গাজার ওপর সীমাহীন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং গাজার জনসংখ্যার বেশির ভাগের স্বেচ্ছায় অভিবাসন সম্ভব করবে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরাসহ অনেকেই বলেন, এটি জোরপূর্বক উচ্ছেদ হবে এবং হামাসের জন্যও গ্রহণযোগ্য নয়।
সশস্ত্র গোষ্ঠীটি বলেছে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা বাকি ৫০ জন জিম্মিকে মুক্তি দিতে রাজি আছে। তবে এ সংখ্যা ইসরায়েলের ধারণা অনুযায়ী জীবিত জিম্মিদের অর্ধেকেরও কম।
এ ছাড়া গোষ্ঠীটি অন্য ফিলিস্তিনিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে বলেও জানিয়েছে। কিন্তু তারা অস্ত্র ত্যাগ বা নির্বাসনে যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।
এদিকে হামাস অস্ত্র ত্যাগ করলেও তা যাচাই করা কঠিন হবে। অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী দ্রুত হামাসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যেতে পারে, যাদের অনেক ফিলিস্তিনি সামরিক দখলদারির বিরুদ্ধে বৈধ সশস্ত্র প্রতিরোধ মনে করবে, এমনকি হামাসের বিরোধীরাও।
১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলের আক্রমণের পর যখন ওই সময়ের শীর্ষস্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন তিউনিসিয়ায় নির্বাসনে যেতে রাজি হয়, তখন ঠিক তাই ঘটেছিল। পাঁচ বছর পর ফিলিস্তিনিদের উত্তরণের শুরুতে হামাস গাজার দৃশ্যে প্রবেশ করে।
হামাসের দৃষ্টিতে, অস্ত্র ত্যাগ করলে ফিলিস্তিনি জনগণ ইসরায়েলের চলমান সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং বসতি সম্প্রসারণের মুখে নিরুপায় থাকবে। তাদের চোখে এটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা প্রায় ধ্বংসের সমতুল্য।
ট্রাম্পের কোনো চাপের লক্ষণ নেই
জুনে ট্রাম্প ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছিলেন, নেতানিয়াহুকে ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিমান হামলা বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়ে। চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এই চমকপ্রদ হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রের ওপর প্রভাবের শক্তিশালী প্রমাণ ছিল।
তবে গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রে এমন কোনো লক্ষণ নেই। ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামাস জিম্মিদের মুক্তি দেবে, কিন্তু ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধ বা সীমিত করতে কোনো প্রকাশ্য চাপ দেননি, যেমনটা সীমিত সাফল্যের সঙ্গে জো বাইডেন করেছেন।
এ ছাড়া ইসরায়েলকে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতি আহ্বান থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করেছে, আন্তর্জাতিক বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমন করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে কানাডার অবস্থানের জন্য তাদের উচ্চ হারে শুল্কারোপের হুমকি দিয়েছে।
ইসরায়েলের ওপর অন্যান্য দেশের প্রভাব তুলনামূলক কম, যার মধ্যে পশ্চিমা ৩০টিরও বেশি দেশ যুদ্ধ শেষের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার কোনো কমতি ইসরায়েলিদের আতঙ্কিত করতে পারে এবং নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতির জন্য ছাড় দেওয়ার দিকে ঠেলতে পারে—তবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। গাজায় হামাসের ওপর আরো চাপ কিভাবে আনা যায় তা অজানা, বিশেষ করে তাদের শীর্ষস্থানীয় সব নেতা এবং হাজার হাজার যোদ্ধাকে হত্যার পর, যা বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক সামরিক হামলার মধ্যে একটি।
ট্রাম্প সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, গাজায় দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে একটি ‘চূড়ান্ত সমাপ্তি’ হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি বলেন, ‘আমরা খুব ভালো কাজ করছি, তবে এটি অবশ্যই শেষ হতে হবে।’